ফরিদপুরের সালথায় ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।
সোমবার (২০ জুলাই) বিকেলে উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বড় বাহিরদিয়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় এ মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বড় বাহিরদিয়া গ্রামের মতি মোল্লার দুই ছেলে হেমায়েত মোল্লা (৩৮) ও সাজ্জাদ মোল্লা (৩২) ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় অন্তত ৮ থেকে ১০ জনের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু কাউকেই ইতালিতে পাঠানো হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
বক্তাদের অভিযোগ, অভিযুক্তরা বিভিন্ন ধাপে অর্থ আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের প্রথমে লিবিয়ায় পাঠায়। সেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের কাছে তাদের জিম্মি করে মুক্তিপণের নামে পরিবারের কাছ থেকে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। এ সময় ভুক্তভোগীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। স্বজনদের দাবি, এখনও কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, সাজ্জাদ মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় অবস্থান করে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইতালিতে পাঠানোর নামে লোক সংগ্রহ করতেন। আর দেশে অবস্থান করে তার বড় ভাই হেমায়েত মোল্লা সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতেন। দুই ভাইয়ের যোগসাজশে বড় বাহিরদিয়া এলাকার বহু পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এছাড়া অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে নানা ধরনের ভয়ভীতি, হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলেও মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়।
ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম বলেন, হেমায়েত মোল্যা আমাকে নানা আশ্বাস দিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর সে আমাকে তার ভাই সাজ্জাদের কাছে হস্তান্তর করে। সাজ্জাদ আমাকে ১৫ থেকে ২০ দিন আটকে রেখে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের ফলে আমি প্রায় দেড় মাস অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলাম। পরে আমাকে সেখানকার একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর আগে আমাকে একটি স্থানে জিম্মি করে রেখে আমার কাছে থাকা নগদ ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে আমার কাছ থেকে প্রায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমার দুই ভাইয়ের কাছ থেকেও টাকা আদায় করা হয়েছে। আমি আমার কষ্টার্জিত টাকা ফেরত চাই এবং হেমায়েত মোল্যার সর্বোচ্চ শাস্তি, ফাঁসির দাবি জানাই।
আরেক ভুক্তভোগী মোহাম্মদ মুক্তার বলেন, আমার ছেলে ও ভাতিজাকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে হেমায়েত মোল্যার কাছে আমরা মোট সাড়ে ১৮ লাখ টাকা দিই। টাকা নেওয়ার পরও তাদের ইতালিতে পাঠানো হয়নি; বরং লিবিয়ায় আটকে রাখা হয়। এরপর তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু হয়। আমরা বিষয়টি নিয়ে হেমায়েতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলি, ‘ওদের ওপর নির্যাতন চলছে। আপনারা হয় দ্রুত ইতালিতে পাঠান, না হলে দেশে ফিরিয়ে আনুন।’ তখন হেমায়েতের ভাই সাজ্জাদ আমাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে কে?’ এই কথা শুনে আমরা বুঝতে পারি, তারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আমাদের অর্থ ফেরতের দাবি জানাই।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত এবং মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত হেমায়েত মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গত ১৭ তারিখ আমরা একটি মানববন্ধন করেছিলাম যা সত্য। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ওরা এই মানববন্ধন করেছে। মুলত গ্রাম্য বিরোধের জের ধরে একটি মহল আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান খান বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


